তালপাখার বাতাস
দুপুর একটার দিকে সিলিং ফ্যানটা হঠাৎ করে একটা ঘড়ঘড় শব্দ করে থেমে গেল।
ফ্যানের ব্লেডগুলো কয়েক সেকেন্ডের জন্য খুব ধীর গতিতে ঘুরল, তারপর একদম স্থির হয়ে গেল। আর সেই সাথে পুরো ঘরটা একটা ভারী, নিস্তব্ধ গরমে ডুবে গেল। ঢাকা শহরের গ্রীষ্মকালের এই একটা রূপ আছে। যখন বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন শুধু বাতাসই বন্ধ হয় না, মনে হয় যেন চারপাশের দেয়ালগুলো থেকে একটা অদৃশ্য আঁচ বের হয়ে মানুষের শরীরের ওপর চেপে বসে।
আয়েশা জানালার পাশের বিছানায় বসে ছিল। ফ্যান বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে তার কপালের ওপর বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। জানালার পাল্লাগুলো পুরোপুরি খোলা, কিন্তু বাইরে গাছের একটা পাতাও নড়ছে না। আকাশটা একদম সাদাটে নীল, রোদের কড়া তেজে চারপাশটা যেন জ্বলে যাচ্ছে।
সে বিছানা থেকে নামল। ফ্লোরের মোজাইক পাথরগুলোও আজ ঠান্ডা নেই, বেশ গরম হয়ে আছে।
গরমের কারণে পরনের সুতির কামিজটা পিঠের সাথে লেপটে আছে। সে হাত দিয়ে কামিজের পেছনের অংশটা একটু টেনে ধরল, যেন চামড়ায় একটু বাতাস লাগে। তারপর সে ধীর পায়ে ঘরের এক কোণায় রাখা পুরোনো কাঠের ওয়ারড্রোবটার দিকে এগিয়ে গেল।
ওয়ারড্রোবের একেবারে নিচের ড্রয়ারটা সাধারণত খোলা হয় না। সেখানে পুরোনো কাপড়, কিছু বাতিল জিনিসপত্র আর বাতিল হয়ে যাওয়া চাদর রাখা থাকে। আয়েশা ড্রয়ারের হাতল ধরে টান দিল। ড্রয়ারটা কাঠের ফ্রেমে একটু আটকে ছিল, একটু জোর দিতেই ক্যাঁচ করে একটা শব্দ করে খুলে এল।
ভেতর থেকে একটা ভ্যাপসা, পুরোনো কাপড়ের গন্ধ বের হলো। ন্যাপথলিনের গন্ধটা খুব হালকা হয়ে মিশে আছে সেই ভ্যাপসা গন্ধের সাথে। আয়েশা দুই হাত দিয়ে পুরোনো চাদরগুলো একটু এদিক-ওদিক সরাল। তার আঙুল খুঁজছে এমন কিছু যা এই দমবন্ধ করা গরমে একটুখানি স্বস্তি দিতে পারে।
চাদরের স্তূপের একদম নিচে তার আঙুলে একটা শক্ত, খসখসে কিছু ঠেকল।
জিনিসটা চ্যাপ্টা। সে জিনিসটার ধার ধরে সাবধানে টেনে বের করে আনল।
একটা তালপাখা।
পাখাটা বেশ বড়। তালপাতার বোঁটা দিয়ে তৈরি গোল হাতলটা বেশ শক্ত। পাখাটার চারপাশে একটা লাল রঙের সুতির কাপড়ের বর্ডার সেলাই করা। বহুদিনের পুরোনো হওয়ার কারণে লাল রঙটা এখন একদম ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় সুতো উঠে গেছে। তালপাতাগুলো শুকিয়ে একটা কালচে খয়েরি রঙ ধারণ করেছে, আর একদম মাঝখানের দিকে একটুখানি ফেটে গেছে।
আয়েশা ফ্লোরে বসে পাখাটার ওপর হাত বোলাল। তালপাতার একটা নিজস্ব, একটু অমসৃণ কিন্তু ঠান্ডা স্পর্শ আছে। সে পাখাটা হাতে নিয়ে মুখের সামনে আনল। তারপর ডান হাতের কবজি ঘুরিয়ে খুব ধীর একটা বাতাস করল।
শোঁ।
পাখাটা বাতাসের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় একটা খুব অদ্ভুত, খুব চেনা শব্দ হলো। এই শব্দটা প্লাস্টিকের হাতপাখার শব্দের মতো নয়। এর মধ্যে একটা ভোঁতা, ভারী আওয়াজ আছে। আর যে বাতাসটা আয়েশার মুখের ওপর এসে লাগল, সেটা সিলিং ফ্যানের বাতাসের চেয়ে একদম আলাদা। এই বাতাসটা খুব নির্দিষ্ট, খুব ঠান্ডা, আর এর সাথে মিশে আছে তালপাতার একটা খুব পুরোনো, মেঠো ঘ্রাণ।
সে পাখাটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
মায়ের ঘরের দরজাটা ভেজানো ছিল। আয়েশা পা টিপে টিপে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
মা বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় আছেন। তার হাতে একটা ছোট তসবিহ। চোখ দুটো বন্ধ। গরমে তার কপালেও ঘাম জমেছে। শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে খসে বিছানার ওপর লুটিয়ে আছে। ঘরের ভেতরটা একদম গুমোট।
আয়েশা নিঃশব্দে মায়ের খাটের পাশে ফ্লোরে বসল।
সে ডান হাতটা একটু উঁচুতে তুলল। তারপর সেই পুরোনো তালপাখাটা দিয়ে মায়ের মুখের দিকে বাতাস করতে শুরু করল।
শোঁ। শোঁ। শোঁ।
পাখা ঘোরানোর একটা নির্দিষ্ট ছন্দ আছে। খুব জোরে ঘোরালে হাত ব্যথা হয়ে যায়, আবার খুব ধীরে ঘোরালে বাতাস লাগে না। আয়েশা কবজির একটা নিখুঁত আন্দোলন তৈরি করল। প্রতিবার পাখাটা নিচে নামার সময় একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা মায়ের মুখের ওপর গিয়ে পড়ছে।
বাতাসের স্পর্শ পেয়ে মায়ের চোখ দুটো একটু কেঁপে উঠল। তিনি চোখ খুললেন না, শুধু তার কপালের ভাঁজগুলো একটু আলগা হয়ে গেল। একটা গভীর স্বস্তির নিশ্বাস পড়ল তার বুক থেকে। তসবিহ ঘোরানো হাতটা থেমে গেল।
আয়েশা একনাগাড়ে পাখা করে যাচ্ছে। তার নিজের হাতের পেশিতে একটু টান পড়ছে, কিন্তু সে সেদিকে খেয়াল করল না। মায়ের মুখের এই শান্ত ভাবটা দেখার জন্য সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে পাখা ঘুরাতে পারে।
কয়েক মিনিট পর মা খুব ধীরে ধীরে চোখ খুললেন।
তিনি ঘাড় ঘুরিয়ে আয়েশার দিকে তাকালেন। তারপর তার দৃষ্টি আয়েশার হাত থেকে নেমে সেই পুরোনো, লাল পাড়ওয়ালা তালপাখাটার ওপর গিয়ে স্থির হলো।
মায়ের চোখের দৃষ্টিটা মুহূর্তের মধ্যে বদলে গেল। ঢাকা শহরের এই গুমোট দুপুরের সমস্ত ক্লান্তি যেন সেই দৃষ্টি থেকে মুছে গেল। তার বদলে সেখানে নেমে এল একটা খুব গভীর, খুব পুরোনো দিনের ছায়া।
"পাখাটা তুই কোথায় পেলি?" মায়ের গলাটা ফিসফিসে।
"ওয়ারড্রোবের একদম নিচের ড্রয়ারে ছিল মা। অনেকদিন তো বের করা হয়নি। একটু ধুলো জমে ছিল, আমি মুছে নিয়েছি।" আয়েশা পাখা ঘোরানো থামাল না।
মা হাত বাড়িয়ে পাখাটার একটা কিনারা ধরলেন। তার আঙুলগুলো সেই ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া লাল কাপড়ের বর্ডারটার ওপর দিয়ে বুলিয়ে গেল।
"এই পাখাটা তোর নানুর হাতের বোনা।"
📍 বরিশাল • ঝালকাঠি
মায়ের আঙুলগুলো পাখাটার ওপর স্থির হয়ে আছে।
"ঝালকাঠিতে গ্রীষ্মকালগুলো এমন গুমোট হতো না রে আয়েশা। রোদের তেজ ছিল, কিন্তু চারপাশে এত গাছপালা, এত পুকুর, খাল... গরমটা মানুষের গায়ে বসে যেত না।"
আয়েশার হাতের পাখার গতিটা একটু ধীর হয়ে এল। সে জানে, এই তালপাখাটা এখন শুধু একটা বাতাস করার যন্ত্র নয়। এটা একটা জানালা। যে জানালা দিয়ে তার মা এখন চল্লিশ বছর আগের একটা পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছেন।
আয়েশার চোখের সামনে ফুটে উঠল একটা বিশাল উঠান। উঠানের চারপাশ দিয়ে বড় বড় মেহগনি আর কড়ই গাছ। দুপুরবেলা রোদের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে গলে গলে উঠানের মাটির ওপর পড়েছে। মাটির ওপর আলোর ছোট ছোট গোল গোল ছায়া।
"তোর নানু তখন দুপুরের খাওয়া শেষ করে উঠানের আমগাছটার নিচে একটা পাটি বিছিয়ে বসত। কারেন্ট তো ছিল না। ওই গাছের ছায়াই ছিল আমাদের ফ্যান, আমাদের এসি। পাটির ওপর তোর খালামনিরা সব গোল হয়ে শুয়ে পড়ত।"
মা চোখ বন্ধ করলেন। তার কপালের ওপর ঘাম শুকিয়ে গেছে তালপাখার বাতাসে।
"তোর নানুর হাতে সবসময় একটা তালপাখা থাকত। ঠিক এই পাখাটার মতোই। সে বসে বসে পান চিবাত, আর ডান হাত দিয়ে একটানা পাখা ঘুরাত। আমাদের সবার গায়ে সেই বাতাস লাগত। ওই পাতার বাতাসের যে কী একটা মায়া ছিল... চোখ এমনিতেই ঘুমে জড়িয়ে আসত।"
মায়ের বর্ণনার সাথে সাথে আয়েশার কানে যেন সেই শব্দটা ভেসে এল। একটা নিস্তব্ধ দুপুর। দূরে কোথাও একটা ঘুঘু পাখি ডাকছে একটানা। আর সেই শব্দের সাথে তাল মিলিয়ে একটা তালপাখার শব্দ। শোঁ... শোঁ... শোঁ। বাতাসে শুকনো পাতা ওড়ার মতো একটা খসখসে আওয়াজ।
সেখানে কোনো এসির মোটর চলার শব্দ ছিল না। কোনো জেনারেটরের আওয়াজ ছিল না। সেখানে ঘাম শুকানোর জন্য মানুষের হাতের ওই তালপাতার ওপরই নির্ভর করতে হতো। আর সেই নির্ভরশীলতার ভেতর একটা অদ্ভুত নির্ভরতা ছিল। একটা মায়ের হাত যখন তার সন্তানের জন্য একটানা পাখা ঘুরায়, তখন সেই বাতাসের সাথে শুধু ঘাম শুকায় না, একটা অদৃশ্য ভালোবাসার পরশও গায়ে লাগে।
"তোর নানুর হাত ব্যথা করত না মা? এতক্ষণ পাখা ঘোরাতে?" আয়েশা খুব নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
মা চোখ খুললেন। তিনি আয়েশার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর একটু হাসলেন।
"মায়ের হাত কি সন্তানের জন্য কখনো ব্যথা করে রে পাগলি? সে তো আমাদের ঘুম না আসা পর্যন্ত পাখা ঘুরিয়েই যেত। মাঝে মাঝে তার চোখ বুজে আসত ঘুমে, কিন্তু হাতের পাখার গতি কমত না।"
মা আয়েশার হাত থেকে পাখাটা নিজের হাতে নিলেন।
তিনি উঠে বসলেন। তারপর পাখাটা দিয়ে আয়েশার মুখের দিকে বাতাস করতে শুরু করলেন। আয়েশার প্রথমটায় একটু অস্বস্তি হলো। সে মায়ের হাত থেকে পাখাটা নিতে চাইল।
"দাও মা, আমি করছি। তোমার তো কষ্ট হচ্ছে।"
"চুপ করে বসে থাক। তোর কপাল দিয়ে ঘাম পড়ছে দেখছিস না?" মা ধমক দিলেন, কিন্তু সেই ধমকের ভেতর একটা খুব নরম, আর্দ্র সুর।
মা পাখা ঘুরাচ্ছেন। আয়েশার মুখের ওপর সেই পুরোনো তালপাতার মেঠো ঘ্রাণওয়ালা বাতাসটা এসে পড়ছে। তার মনে হলো, সে যেন এখন ঢাকা শহরের এই ফ্ল্যাটে নেই। সে যেন সেই ঝালকাঠির আমগাছের নিচে পাটির ওপর শুয়ে আছে। আর তার মাথার কাছে বসে আছেন তার নানু। এই তালপাখাটা শুধু একটা বস্তু নয়, এটা একটা প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে হাতবদল হওয়া একটা অদৃশ্য ভালোবাসার রূপ।
কিছুক্ষণ পর মা পাখাটা বিছানার ওপর রেখে দিলেন।
"যা, রান্নাঘর থেকে একটু ঠান্ডা পানি নিয়ে আয়। গলাটা একদম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে এই গরমে।"
আয়েশা মাথা নেড়ে ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়াল। পাখাটা মায়ের পাশেই পড়ে রইল।
রান্নাঘরটা যেন একটা জ্বলন্ত উনুন।
দুপুরের রোদটা সরাসরি রান্নাঘরের জানালার টাইলসের ওপর পড়ে রান্নাঘরটাকে তাতিয়ে রেখেছে। ফ্যান নেই। বাতাস ঢোকার কোনো রাস্তা নেই। আয়েশা রান্নাঘরে ঢুকেই অনুভব করল একটা ভ্যাপসা, আটকে পড়া গরম বাতাস তার শরীরের ওপর এসে ধাক্কা মারল।
সে ফ্রিজের পাল্লাটা খুলল। ফ্রিজ খোলার সাথে সাথে ভেতর থেকে একরাশ কনকনে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে এসে তার মুখে-বুকে লাগল। এই মুহূর্তের জন্য এই ঠান্ডা বাতাসটা পৃথিবীর সবচেয়ে আরামদায়ক জিনিস মনে হলো তার কাছে।
ফ্রিজের দরজার তাকে একটা কাঁচের বোতলে পানি রাখা আছে। কিন্তু আয়েশা বোতলটা নিল না। তার দৃষ্টি আটকে গেল ফ্রিজের একদম নিচের ভেজিটেবল বক্সটার দিকে।
বক্সের ভেতর দুইটা বড়, গাঢ় সবুজ রঙের কাঁচা আম রাখা আছে।
কাল বিকালেই বাজার থেকে আনা হয়েছিল। আমগুলোর গায়ের রঙটা একদম নিখুঁত সবুজ। কোথাও কোনো হলুদ বা লালচে দাগ নেই। আয়েশা আম দুটো হাতে তুলে নিল। ফ্রিজের ঠান্ডায় আমগুলোর গা একদম হিম হয়ে আছে। আঙুলের ডগায় সেই ঠান্ডা স্পর্শটা খুব আরামদায়ক। আমের বোঁটার কাছে একটুখানি সাদা কষ শুকিয়ে শক্ত হয়ে আছে।
এই অসহ্য গরমে শুধু ঠান্ডা পানি খেলে তৃষ্ণা মেটে না। তৃষ্ণা মেটানোর জন্য এমন কিছু দরকার যা শরীরের ভেতরের আগুনটাকেও একটু শান্ত করতে পারে।
আয়েশা ঠিক করল সে কাঁচা আমের শরবত বানাবে। কিন্তু সাধারণ শরবত নয়, আম পোড়া শরবত।
সে আম দুটো বেসিনের ভেতর রাখল। তারপর কলের পানি ছেড়ে দিল। পানির ধারাটা কাঁচা আমের গায়ের ওপর পড়তেই একটা চকচকে ভাব চলে এল। আয়েশা বুড়ো আঙুল দিয়ে আমের গায়ের শুকিয়ে থাকা কষটা ঘষে ঘষে তুলল। পানির ছপছপ শব্দ হচ্ছে। আম ধোয়া শেষ হলে সে একটা পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে আমগুলোর গা থেকে পানি মুছে নিল।
এবার সে চুলার দিকে গেল।
গ্যাসের চুলার নবটা ঘুরিয়ে সে আগুন জ্বালাল। নীলচে রঙের শিখাটা হিসহিস শব্দ করে জ্বলে উঠল। আয়েশা কোনো কড়াই বা তাওয়া বসাল না। সে একটা পুরনো রুটি সেঁকার লোহার জালি চুলার ওপর রাখল। জালির লোহাগুলো আগুনের তাপে খুব দ্রুত লাল হতে শুরু করল।
আয়েশা সাবধানে কাঁচা আম দুটো সেই গরম জালির ওপর বসিয়ে দিল।
আগুনের সরাসরি সংস্পর্শে আসার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমের সবুজ খোসাটা বিক্রিয়া করতে শুরু করল। খোসার যে অংশটা আগুনের ঠিক ওপরে আছে, সেখান থেকে একটা খুব মৃদু, চিড়চিড় শব্দ হতে লাগল। কাঁচা আমের গায়ে থাকা খুব সূক্ষ্ম পানি বাষ্প হয়ে উড়তে শুরু করেছে।
আয়েশা চুলার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আগুনের তাপ আর গরম আবহাওয়া মিলে তার মুখটা একদম লাল হয়ে গেছে। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরে গালের ওপর দিয়ে পড়ছে। কিন্তু সে সেদিকে খেয়াল করল না। তার পুরো মনোযোগ এখন ওই দুইটা আমের দিকে।
একটু পরেই আমের নিচের দিকটা কালো হতে শুরু করল। খোসাটা পুড়ে খসে পড়ার মতো হয়ে যাচ্ছে। আর সেই পোড়া খোসা থেকে একটা অভাবনীয় সুন্দর, ধোঁয়াটে ঘ্রাণ বের হতে লাগল। এই গন্ধটা কাঁচা আমের টক গন্ধ আর পোড়া কাঠকয়লার গন্ধের একটা অদ্ভুত মিশ্রণ। এই গন্ধটা নাকে গেলেই জিভে পানি চলে আসে।
আয়েশা একটা লোহার চিমটা দিয়ে আম দুটোকে খুব সাবধানে উল্টে দিল।
যে দিকটা এতক্ষণ ওপরে ছিল, সেটা এখন আগুনের দিকে গেল। আর পোড়া কালো দিকটা ওপরের দিকে চলে এল। কালো খোসাটার মাঝখান দিয়ে একটুখানি ফেটে আমের ভেতরের ফ্যাকাশে হলুদ রঙের শাঁসটা উঁকি দিচ্ছে। সেই ফাটা অংশ দিয়ে আমের ভেতরের রস ফুটতে ফুটতে ছোট ছোট বুদবুদ হয়ে বেরিয়ে আসছে। বুদবুদগুলো গরম লোহার ওপর পড়ে ছ্যাঁত ছ্যাঁত করে শব্দ করছে।
পুরো রান্নাঘরটা এখন কাঁচা আম পোড়ার এই জাদুকরী গন্ধে ভরে উঠেছে। এই গন্ধটা যেন গরমকালের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।
প্রায় দশ মিনিট পোড়ানোর পর আমগুলো একদম নরম হয়ে গেল। খোসাটা পুরো কয়লার মতো কালো। আয়েশা চুলা বন্ধ করে দিল। চিমটা দিয়ে আম দুটোকে তুলে সে একটা বাটিতে রাখা ঠান্ডা পানির ভেতর ডুবিয়ে দিল।
গরম আম ঠান্ডা পানিতে পড়ার সাথে সাথে একটা বিশাল ছ্যাঁত শব্দ হলো। পানি থেকে অনেকটা ধোঁয়া ওপরের দিকে উঠে গেল। পানির ভেতর আমের পোড়া কালো খোসাগুলো থেকে একটুখানি কালচে রঙ পানিতে মিশে পানিটাকে একটু ঘোলাটে করে দিল।
আমগুলো একটু ঠান্ডা হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।
এই অপেক্ষার ফাঁকে আয়েশা শরবতের বাকি উপকরণগুলো গোছাতে শুরু করল। সে মসলার র্যাক থেকে একটা ছোট কাঁচের বয়াম নামাল। বয়ামের ভেতর আস্ত জিরা। সে আরেকটা চুলায় ছোট একটা ফ্রাইপ্যান বসিয়ে তাতে এক চামচ জিরা দিয়ে দিল। তেল ছাড়া শুকনো তাওয়ায় জিরা ভাজার শব্দটা খুব সুন্দর। চড়চড় শব্দ। জিরা ভাজার গন্ধটা আম পোড়ার গন্ধের সাথে মিলে রান্নাঘরটাকে একটা মসলার স্বর্গে পরিণত করল।
জিরাগুলো হালকা কালচে হতেই সে চুলা থেকে নামিয়ে নিল। শিলপাটায় এই ভাজা জিরাগুলোকে বেটে একদম মিহি পাউডার করতে হবে। আয়েশা পাটায় জিরাগুলো রেখে শিলের হাতল দিয়ে কয়েকবার চাপ দিল। মট-মট করে জিরাগুলো গুঁড়ো হয়ে গেল। ভাজা জিরার পাউডার থেকে যে উষ্ণ ঘ্রাণটা বের হলো, সেটা শরবতের স্বাদটাকে একদম অন্য মাত্রায় নিয়ে যাবে।
ততক্ষণে বাটির ভেতরের আমগুলো হাতের ধরার মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে।
আয়েশা আম দুটো পানি থেকে তুলে একটা প্লেটে রাখল। এবার খোসা ছাড়ানোর পালা। পোড়া আমের খোসা খুব সহজেই উঠে আসে। আয়েশা আঙুল দিয়ে একটু টান দিতেই কালো খোসাটা ভেতরের শাঁস থেকে আলাদা হয়ে এল। খোসার ভেতরের দিকটায় এখনো একটুখানি আমের রস লেগে আছে।
খোসা ছাড়ানোর পর ভেতরের শাঁসটা দেখতে একদম হলদেটে-সবুজ রঙের। শাঁসটা আগুনে পুড়ে একদম নরম, তুলতুলে হয়ে গেছে। আর এর ভেতর থেকে বের হচ্ছে একটা খুব কড়া, টক আর পোড়া গন্ধ।
আয়েশা ডান হাত দিয়ে আমের শাঁসটাকে চটকাতে শুরু করল। আঙুলের চাপে নরম শাঁসটা একদম গলে পেস্টের মতো হয়ে যাচ্ছে। আমের আঁটিটা মাঝখানে শক্ত হয়ে আছে। আয়েশা খুব সাবধানে আঁটিটার চারপাশ থেকে সমস্ত শাঁস ছাড়িয়ে নিয়ে আঁটিটা ফেলে দিল।
প্লেটের ওপর এখন প্রায় এক কাপের মতো পোড়া আমের শাঁস।
সে এই শাঁসটা একটা বড় কাঁচের জগের ভেতর ঢালল। জগের ভেতর আগে থেকেই বেশ কয়েক টুকরো বরফ রাখা ছিল। বরফের ওপর আমের শাঁসটা পড়ার সময় একটা নরম, থপথপ শব্দ হলো।
এবার শরবতের আসল জাদু মেশানোর পালা।
আয়েশা জগের ভেতর দিল তিন চামচ চিনি। কাঁচা আমের টককে ব্যালেন্স করার জন্য চিনি দেওয়া খুব জরুরি। এরপর দিল হাফ চামচ বিট লবণ। বিট লবণের একটা নিজস্ব, একটু গন্ধওয়ালা স্বাদ আছে যেটা শরবতকে খুব মুখরোচক করে তোলে। তারপর সেই পাটায় বেটে রাখা ভাজা জিরার গুঁড়ো। সবশেষে দুইটা কাঁচা মরিচ মাঝখান থেকে চিরে সে জগের ভেতর ফেলে দিল। শরবতে একটুখানি ঝাল ঝাল ভাব না থাকলে সেই আসল তৃপ্তিটা পাওয়া যায় না।
এবার পানি মেশানোর পালা।
ফ্রিজের সেই ঠান্ডা পানির বোতলটা থেকে সে জগের ভেতর পানি ঢালতে শুরু করল। পানি পড়ার সাথে সাথে বরফের টুকরোগুলো ওপরের দিকে ভেসে উঠল। আমের শাঁস, জিরা গুঁড়ো আর বিট লবণ পানির সাথে মিশে একটা খুব সুন্দর, হালকা সবুজ আর খয়েরি রঙের মিশ্রণ তৈরি করল।
আয়েশা একটা লম্বা হাতলওয়ালা স্টিলের চামচ দিয়ে জগের ভেতরের সবকিছু নাড়তে শুরু করল।
চামচটা জগের কাঁচের গায়ে লেগে টুং-টাং শব্দ তৈরি করছে। বরফের টুকরোগুলো চামচের সাথে বাড়ি খেয়ে গোল হয়ে ঘুরছে। নাড়ার সাথে সাথে চিনিগুলো গলতে শুরু করেছে। আয়েশা একটানা নেড়ে যাচ্ছে। এই নাড়ার শব্দটা রান্নাঘরের স্তব্ধতাটাকে ভেঙে একটা খুব সতেজ, খুব চনমনে পরিবেশ তৈরি করেছে।
সে চামচটা তুলে এক ফোঁটা শরবত নিজের হাতের তালুতে রাখল। তারপর জিভ দিয়ে একটুখানি চেখে দেখল।
স্বাদটা একদম নিখুঁত। প্রথমে জিভে লাগে কাঁচা আমের সেই কড়া টক, তার সাথে সাথে পোড়া গন্ধটা নাকের ভেতর দিয়ে মস্তিষ্কে ধাক্কা মারে। তারপর একটুখানি মিষ্টি, বিট লবণের নোনতা স্বাদ আর সবশেষে গলার কাছে কাঁচা মরিচের খুব হালকা একটা ঝাঁজ। এই একটা শরবতের ভেতর যেন গ্রীষ্মকালের সমস্ত চরিত্র একসাথে মিশে আছে।
সে চারটা কাঁচের গ্লাস ট্রেতে সাজাল। প্রতিটা গ্লাসে সমান ভাগে শরবত ঢালল। গ্লাসের গায়ে সাথে সাথে ঠান্ডা পানির বিন্দু জমে গেল। শরবতের ওপর জিরার গুঁড়োগুলো ভাসছে, আর একেকটা গ্লাসে একটা করে বরফের টুকরো টলটল করছে।
আয়েশা ট্রেটা হাতে নিয়ে মায়ের ঘরের দিকে হাঁটা দিল।
মা এখনো বিছানায় শুয়ে আছেন। তার হাতের কাছে সেই তালপাখাটা রাখা। ফ্যান এখনো আসেনি। ঘরের ভেতর গরমটা যেন আরও একটু ভারী হয়েছে।
"মা, উঠে বসো। শরবত নিয়ে এসেছি।" আয়েশা ট্রেটা খাটের পাশের ছোট টেবিলটার ওপর রাখল।
মা চোখ খুললেন। তিনি উঠে বসে খাটের হেডবোর্ডে হেলান দিলেন। আয়েশা একটা গ্লাস মায়ের হাতে দিল।
মা গ্লাসটা হাতে নিয়েই তার ঠান্ডা স্পর্শে একটু চমকে উঠলেন। গ্লাসের গা থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে তার আঙুলে পড়ছে। তিনি গ্লাসটা নাকের কাছে নিয়ে একটা শ্বাস নিলেন।
"আম পোড়া শরবত! এত গরমে তুই চুলার পাড়ে গিয়ে আম পুড়িয়েছিস?" মায়ের গলায় একটু বকুনি, কিন্তু চোখদুটো শরবতের দিকে চকচক করছে।
"খুব একটা সময় লাগেনি মা। তুমি খেয়ে দেখো আগে। লবণ ঠিক আছে কি না।"
মা গ্লাসে চুমুক দিলেন। তিনি খুব ছোট একটা চুমুক দিলেন প্রথমে। তারপর চোখ দুটো বন্ধ করে ফেললেন। শরবতটা তার গলা দিয়ে নামার সাথে সাথে তার মুখের পেশিগুলো একদম শিথিল হয়ে গেল। এই অসহ্য গরমে এক গ্লাস ঠান্ডা আম পোড়া শরবত যেন একটা মরুভূমিতে হঠাৎ পাওয়া ওয়েসিসের মতো।
"আহ! বুকটা একদম জুড়িয়ে গেল রে আয়েশা। এই জিরার গন্ধটা খুব সুন্দর উঠেছে।" মা আরেকটা বড় চুমুক দিলেন।
আয়েশা আরেকটা গ্লাস নিয়ে বড় ভাই আর ছোট ভাইয়ের ঘরের দিকে গেল। তারা দুজনেই ফ্লোরে একটা পাটি বিছিয়ে খালি গায়ে শুয়ে আছে। কারেন্ট না থাকার কারণে তাদের দুজনের মেজাজই বেশ খিটখিটে হয়ে আছে।
"এই নে, শরবত খা। মাথা ঠান্ডা হবে।" আয়েশা দুই ভাইয়ের মাঝখানে গ্লাস দুটো নামিয়ে রাখল।
ছোট ভাই এক লাফে উঠে বসল। সে গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক নিশ্বাসে অর্ধেকটা শরবত শেষ করে ফেলল।
"উফ! আপু! তুই তো জাস্ট জীবন বাঁচিয়ে দিলি। বাইরে যে লেভেলের গরম, মনে হচ্ছিল সেদ্ধ হয়ে যাব। এই শরবতটা তো পুরা অমৃত।" ছোট ভাই বরফের টুকরোটা চিবানোর চেষ্টা করতে করতে বলল।
বড় ভাই একটু ধীরেসুস্থে খাচ্ছে। সে শরবতের স্বাদটা বোঝার চেষ্টা করছে।
"টকটা একদম ব্যালেন্সড হয়েছে। আর এই পোড়া ফ্লেভারটা শরবতের মেইন আকর্ষণ। তুই আরেক গ্লাস বানাসনি তোর জন্য?" বড় ভাই জিজ্ঞেস করল।
"বানিয়েছি। আমি রান্নাঘরে গিয়ে খাচ্ছি।"
আয়েশা আবার রান্নাঘরে ফিরে এল। তার নিজের গ্লাসটা বেসিনের পাশে রাখা। সে গ্লাসটা হাতে নিয়ে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
সে শরবতে একটা চুমুক দিল। ঠান্ডা তরলটা তার গলা দিয়ে পেটে যাওয়ার সাথে সাথে তার শরীরের ভেতরের এতক্ষণের গরম আর ক্লান্তিটা যেন একটা ম্যাজিকের মতো দূর হয়ে গেল।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাথার ওপরের ফ্যানটা ঘড়ঘড় করে ঘুরতে শুরু করল।
কারেন্ট চলে এসেছে।
ফ্যানের ব্লেডগুলো স্পিড নেওয়ার সাথে সাথে রান্নাঘরের ভেতরের গুমোট বাতাসটা কেটে গিয়ে একটা খুব আরামদায়ক হাওয়া বইতে শুরু করল। জানালার বাইরে একটা কাক ডেকে উঠল। ঢাকা শহরটা যেন আবার তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে এল।
আয়েশা জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকিয়ে শরবতের গ্লাসটা ধরে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্যানের বাতাসে তার কপালের ঘামগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। তার মনে হলো, জীবনের এই ছোট ছোট বিরতিগুলো, এই গরম, এই শরবত, এই কারেন্ট যাওয়া আর আসা—এগুলোই আসলে জীবনটাকে এত বৈচিত্র্যময় করে তোলে।
বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হতে চলল।
রাতের খাবারের প্রস্তুতি শুরু করতে হবে। দুপুরের ওই গরমের পর আজ রাতে ভারী কোনো খাবার খেতে কারোই ইচ্ছা করবে না। আয়েশা ঠিক করল, আজ সে আম ডাল রাঁধবে। পাতলা মসুর ডালের সাথে কাঁচা আমের টুকরো। গ্রীষ্মকালের রাতে এই ডালের কোনো তুলনা হয় না।
সে একটা স্টিলের বাটিতে এক কাপ মসুর ডাল নিল। মসুর ডালের দানাগুলো ছোট, কমলা রঙের। সে কলের নিচে বাটিটা রেখে ডাল ধুতে শুরু করল। ডাল ধোয়ার সময় পানিটা একটা ঘোলাটে, সাদাটে গোলাপি রঙ ধারণ করল। আয়েশা আঙুল দিয়ে ডালগুলো কচলে কচলে তিন-চারবার পানি পাল্টে খুব ভালো করে ধুলো, যতক্ষণ না পানিটা একদম স্বচ্ছ কাঁচের মতো হলো।
সে চুলায় একটা মাঝারি সাইজের সসপ্যান বসাল। তাতে পরিমাণমতো পানি দিয়ে ধোয়া ডালগুলো ঢেলে দিল। সাথে কয়েকটা কাঁচা মরিচ চিরে দিয়ে দিল আর সামান্য একটু লবণ।
চুলার আঁচটা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। পানি ফুটতে শুরু করেছে।
ডাল সেদ্ধ হওয়ার প্রথম পর্যায়ে একটা জিনিস ঘটে। ডালের ভেতরকার প্রোটিন আর স্টার্চ পানির ওপর ভাসতে শুরু করে। সসপ্যানের পানির ওপর একটা সাদা, ফেনার মতো আস্তরণ তৈরি হয়। এই ফেনাটা তরকারির স্বাদ একটু নষ্ট করে দিতে পারে, আর দেখতেও খুব একটা ভালো লাগে না।
আয়েশা একটা গোল চামচ দিয়ে খুব সাবধানে সেই ফুটন্ত পানির ওপর থেকে সাদা ফেনাগুলো তুলে তুলে বেসিনে ফেলতে লাগল। চামচ দিয়ে ফেনা তোলার এই কাজটায় একটা অদ্ভুত মনোযোগ দরকার হয়। ডালের পানি যেন চামচে না উঠে আসে, শুধু ফেনাটা যেন ওঠে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়।
ফেনা তোলা শেষ হলে সে সসপ্যানের ভেতর একটুখানি হলুদের গুঁড়ো দিল। হলুদের গুঁড়ো পানির সাথে মিশে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ডালের রঙটাকে একটা সুন্দর, উজ্জ্বল হলুদ রঙে পরিণত করল। ডাল সেদ্ধ হওয়ার একটা খুব চেনা, খুব ঘরোয়া গন্ধ রান্নাঘরে ছড়িয়ে পড়ল।
ডাল প্রায় আধা সেদ্ধ হয়ে এসেছে। দানাগুলো ফেটে ফেটে গেছে।
এবার আম দেওয়ার পালা।
আয়েশা ফ্রিজ থেকে আরেকটা কাঁচা আম বের করে নিল। বঁটির সামনে বসে সে আমটার খোসা ছাড়াল। তারপর আমটাকে লম্বালম্বি করে কয়েকটা ফালিতে কাটল। আমের ফালিগুলো একদম সাদা, আর খুব শক্ত। সে এই ফালিগুলো ফুটন্ত ডালের ভেতর ঢেলে দিল।
কাঁচা আম ডালের পানির সাথে ফুটতে শুরু করল। আমের টক রস ডালের সাথে মিশে যাচ্ছে। দশ মিনিটের মধ্যেই আমের ফালিগুলো সেদ্ধ হয়ে একদম নরম হয়ে গেল। আয়েশা একটা ডালঘুঁটনি নিল। কাঠের তৈরি ডালঘুঁটনি। সে ডালঘুঁটনিটা সসপ্যানের ভেতর রেখে দুই হাতের তালুর মাঝে ধরে খুব জোরে ঘষতে শুরু করল।
ঘ্যাঁচ-ঘ্যাঁচ-ঘ্যাঁচ।
ডালঘুঁটনির ঘর্ষণে ডালের দানাগুলো আর আমের নরম ফালিগুলো একদম গলে মিশে গেল। ডালটা এখন আর দানা দানা নেই, এটা একটা ঘন, মসৃণ তরলে পরিণত হয়েছে। আমের টক আর ডালের গন্ধ মিলে একটা অসাধারণ সুবাস তৈরি হয়েছে।
ডাল রান্নার আসল জাদুটা লুকিয়ে থাকে একদম শেষের দিকে। ফোড়ন বা বাগার দেওয়া।
আয়েশা ডালের সসপ্যানটা চুলা থেকে নামিয়ে পাশে রাখল। এবার সে চুলায় একটা ছোট লোহার তরকা প্যান বসাল। প্যানটা গরম হতেই সে তাতে দুই চামচ সরিষার তেল দিল। আম ডালে সয়াবিন তেলের চেয়ে সরিষার তেলের ফোড়ন বেশি ভালো লাগে। তেলের একটা নিজস্ব ঝাঁজ আছে যেটা আমের টক ভাবটার সাথে খুব ভালো মানায়।
তেল থেকে ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে।
আয়েশা তেলের ভেতর প্রথমে দুইটা শুকনো লাল মরিচ দিল। মরিচগুলো তেলের ভেতর পড়ে মুহূর্তের মধ্যে কালচে লাল হয়ে গেল। এরপর সে দিল একটুখানি আস্ত কালো সরিষার দানা।
সরিষার দানা গরম তেলে পড়ার সাথে সাথে একটা উৎসব শুরু হয়ে গেল। চটপট চটপট করে সরিষার দানাগুলো তেলের ভেতর ফুটতে শুরু করল। কয়েকটা দানা লাফিয়ে প্যানের বাইরে পড়ে গেল। আয়েশা একটু পিছিয়ে দাঁড়াল। সরিষা ফোটার এই শব্দটা রান্নাঘরের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর শব্দগুলোর একটা।
সরিষার দানা ফোটা শেষ হলে সে কয়েক কোয়া থেঁতো করা রসুন তেলের ভেতর ছেড়ে দিল। রসুনের কোয়াগুলো তেলের ভেতর ছড়ছড় শব্দ করে ভাজা হতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রসুনের রঙটা সাদা থেকে একটা সুন্দর সোনালী বাদামী রঙ ধারণ করল। পোড়া রসুন, শুকনো মরিচ আর সরিষার তেলের এই মিশ্রিত গন্ধটা এত কড়া যে ড্রয়িংরুম থেকেও হয়তো এর সুবাস পাওয়া যাচ্ছে।
এবার চূড়ান্ত মুহূর্ত।
আয়েশা খুব সাবধানে গরম তেলের এই ফোড়নটা ডালের সসপ্যানের ভেতর ঢেলে দিল।
ছ্যাঁত! একটা বিশাল শব্দ হলো। গরম তেল ডালের পানির সংস্পর্শে এসে একটা তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করল। ফোড়নের প্যান থেকে ধোঁয়া উঠে পুরো রান্নাঘরটাকে একটা সুবাসের মেঘে ঢেকে দিল। আয়েশা সাথে সাথে সসপ্যানের ঢাকনাটা আটকে দিল, যেন ফোড়নের এই জাদুকরী গন্ধটা ডালের ভেতরই আটকে থাকে, বাইরে উড়ে না যায়।
আম ডাল রান্না শেষ।
আয়েশা চুলা বন্ধ করে দিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রান্নার এই পুরো প্রক্রিয়াটা একটা যাত্রার মতো। শুরু হয় সাধারণ কিছু উপকরণ দিয়ে, আর শেষ হয় একটা অসাধারণ অনুভূতিতে।
রাতের খাবার পর্ব আজ খুব সাদামাটা।
সাদা ভাত, আম ডাল আর দুপুরের একটুখানি লাউ চিংড়ি। কিন্তু এই সাদামাটা খাবারের ভেতরেই একটা অদ্ভুত তৃপ্তি আছে। টক ডাল দিয়ে ভাত মাখিয়ে খাওয়ার সময় গরমে ক্লান্ত শরীরটা যেন একটুখানি আরাম পায়।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে আয়েশা তার নিজের ঘরের জানালার পাশে এসে দাঁড়াল।
রাতের আকাশটা আজ খুব পরিষ্কার। দুপুরের সেই গুমোট ভাবটা একদম কেটে গেছে। এখন একটা খুব হালকা, খুব ঠান্ডা বাতাস বইছে।
বাতাসের সাথে ভেসে আসছে জানালার বাইরের সেই বেলি ফুল গাছটার গন্ধ। আজ রাতে গন্ধটা একটু অন্যরকম লাগছে আয়েশার কাছে। এই গন্ধটার সাথে এখন আর শুধু ঝালকাঠির স্মৃতি বা মায়ের দীর্ঘশ্বাস মিশে নেই। এর সাথে মিশে আছে আজকের দুপুরের সেই আম পোড়া শরবতের স্বস্তি, আর এই রাতের আম ডালের তৃপ্তি।
সে চোখ বন্ধ করে জানালার গ্রিলে মাথা ঠেকাল।
তার মনে পড়ল সেই পুরোনো তালপাখাটার কথা। পাখাটা এখনো হয়তো মায়ের বিছানার পাশেই পড়ে আছে। কাল সকালে আবার হয়তো ফ্যান বন্ধ হবে। আবার হয়তো সেই পাখাটার প্রয়োজন পড়বে। পুরোনো জিনিসগুলো এভাবেই বেঁচে থাকে মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের ভালোবাসায়।
সে একটা গভীর শ্বাস নিল। বেলি ফুলের গন্ধটা তার ফুসফুস ভরিয়ে দিল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শান্তিগুলো এই ছোট ছোট, খুব সাধারণ জিনিসগুলোর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে। শুধু চোখ মেলে দেখতে হয়, আর বুক ভরে শ্বাস নিতে হয়।